ছবি: সংগ্রহীত
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর দীর্ঘ সময় তেমন পদক্ষেপ না নিলেও কয়েক মাস থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে আরব দেশগুলো। তবে তাদের এই পরিকল্পনায় সব থেকে বড় সমস্যা ইসরায়েলের একগুঁয়েমি আচরণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অক্ষমতা।
বর্তমানে আরব পরিকল্পনাকে একটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আরব দেশগুলোর গাজা ইস্যুতে এক হয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ। আর এই জোট ইসরায়েলের গাজা উপত্যকাকে জনশূন্য করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
গাজাকে পুনর্গঠনের জন্য ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট থেকে চেষ্টা চালাচ্ছে মিশর। এরপর থেকে এই সমস্যা নিরসনে কাজ করছে আরব রাষ্ট্র, ওআইসি এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ।
ফিলিস্তিনি ইস্যুতে আরব দেশগুলো এতদিন তেমন মাথা না ঘামালেও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখা এবং ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর গাজার ব্যাপারে নতুন পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আরব দেশগুলোকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।
টেকনোক্র্যাটদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্থানীয় স্টিয়ারিং কমিটি প্রতিষ্ঠার উপর নির্ভর করে মিশরের প্রথম ছয় মাসের জন্য ৫৩ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পদক্ষেপ নতুন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে কাজ করবে। কিন্তু এই পদ্ধতির কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে যা বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হতে পারে।
ফিলিস্তিনের বিষয়ে মিশরের এ ধরনের পদক্ষেপে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা স্পষ্ট। ফিলিস্তিন গাজা নিয়ন্ত্রণের অনুমতি পেলে পশ্চিম তীরের সঙ্গে একীভূত হয়ে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। যেহেতু কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল, তাই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্যে বিভক্তি এবং বিভাজনের বর্তমান অবস্থা তাদের স্বার্থ পূরণ করবে।
নেতানিয়াহুকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য, আরব রাষ্ট্রগুলোকে যতটা সম্ভব অন্যান্য পক্ষের সমর্থন প্রয়োজন। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এমনটি হলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের পদক্ষেপ মেনে নিতে বাধ্য করবে।
ইসরায়েলি প্রতিরোধের বাইরে, আরব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে ফিলিস্তিন সরকার গঠন। অসলো চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর অজনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাসের অধীনে রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার অভাব দৃশ্যমান।
বছরের পর বছর ধরে, আব্বাস ইসরায়েলের সাথে নিরাপত্তা সমন্বয় অব্যাহত রেখে তার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে আরও গভীর করেছে। ২০০৬ সাল থেকে নির্বাচন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তার বৈধতা হারিয়েছে। তার নেতৃত্ব ক্রমবর্ধমানভাবে দমন-পীড়ন দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এবং নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান সৃষ্টিতে বেশ ঘাটতি রয়েছে দেশটির। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে গাজা এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের গত ১৬ মাসের গণহত্যার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ফিলিস্তিন সরকারের ব্যর্থতা।
ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আব্বাস মূলত অনুপস্থিত ছিলেন। তার সরকার কেবল ফিলিস্তিনি জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেনি বরং ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব রাষ্ট্রসহ বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের কাছেও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি, তিনি উত্তর পশ্চিম তীরের শহর জেনিনে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলির উপর দমন অভিযান শুরু করেছেন এবং ইসরায়েল কর্তৃক বন্দী, নিহত বা আহত ফিলিস্তিনিদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছেন। এই পদক্ষেপ, ফিলিস্তিনি জনগণ এবং তাদের নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছে।
আরব বিশ্বের কিছু অংশ, সেইসাথে ফিলিস্তিনি নাগরিক সমাজ এবং প্রবাসীরা নতুন নেতৃত্বের জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে, আব্বাস এবং তার অনুগতরা এই ধরনের প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করেছেন।
যদি আরব রাষ্ট্রগুলো নেতানিয়াহুর একগুঁয়েমি, আব্বাসের স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ ফিলিস্তিনি বিভাজনের রাজনৈতিক সমস্যা অতিক্রম করতে পারে, তবে তারা গাজাকে আরও স্থিতিশীল এবং স্বায়ত্তশাসিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হতে পারে। আরব রাষ্ট্রগুলোর পরিকল্পনা এই বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা তা এখন দেখার বিষয়।
সরদার একরাম
মন্তব্য করুন